মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের চর ও উপকূলীয় অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে সেখানে সূর্যমুখী চাষের সঙ্গে মৌচাষের সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশে ভোজ্যতেল ও মধু—দুই খাতেই আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ)-তে সোমবার যাত্রাবিরতিকালে উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সম্ভাবনাময় গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্যোগের প্রদর্শনী ঘুরে দেখার সময় তাঁর সামনে উপস্থাপিত এক ব্রিফিংয়ে এ সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরা হয়। সরকারি সফরসূচি অনুযায়ী, এ দিন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা বগুড়া সফরে যান এবং ফেরার পথে আরডিএ-তে স্বল্প সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আরডিএ-তে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, সূর্যমুখীভিত্তিক তেল উৎপাদন, মৌচাষ সম্প্রসারণ, গ্রামীণ শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবিকা উন্নয়ন নিয়ে সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করা হয়। আয়োজক-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বগুড়ার সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট তেলবীজ উৎপাদন প্রায় ১৭.৪ লাখ টন। এর মধ্যে সরিষা ও রাই সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে, আর সূর্যমুখী এখনো তুলনামূলক ছোট ফসল। একই সময়ে দেশের মোট ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন টন, কিন্তু দেশীয় তেলবীজ মিলিয়ে পূরণ হয় মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ভোজ্যতেলের বাজারে বাংলাদেশ এখনো বড়ভাবে আমদানিনির্ভর।
উপস্থাপনায় আরও জানানো হয়, বর্তমানে দেশে সূর্যমুখী আবাদ ও উৎপাদন সীমিত হলেও চর ও উপকূলীয় পতিত জমিকে কাজে লাগানো গেলে চিত্র দ্রুত বদলাতে পারে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব এলাকায় বড় পরিসরে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেলবীজ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশীয় ভোজ্যতেলের জোগান বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এতে একদিকে আমদানি কমবে, অন্যদিকে কৃষকের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলভিত্তিক খাদ্যউৎস তৈরি হওয়ায় মৌচাষেরও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
মৌখাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত ব্রিফ করেন আরডিএ, বগুড়ার উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে মৌখাতের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইনব্রিডিং, পর্যাপ্ত বী-ফ্লোরার অভাব, মৌ নীতিমালার ঘাটতি এবং মৌজাত পণ্য যেমন পোলেন, প্রোপোলিস, ভেনম ও মোম প্রক্রিয়াজাতকরণের শিল্পের অনুপস্থিতি।
তিনি আরও বলেন, শুধু মৌমাছি উৎপাদন ও মৌজাত পণ্যের আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ করে এমন শক্তিশালী একক কোম্পানি এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, নভেম্বরের সরিষা ফুল থেকে শুরু করে পরে কালোজিরা, ধনিয়া, লিচু এবং এরপর সূর্যমুখী এই ধারাবাহিক বী-ফ্লোরা তৈরি করা গেলে দেশের মৌচাষকে আরও উৎপাদনমুখী করা সম্ভব হবে।
ড. মনিরুল ইসলামের ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, মৌচাষকে শুধু মধু উৎপাদনের মধ্যে সীমিত না রেখে পোলেন, প্রোপোলিস, মৌমোম ও মৌভেনম ভিত্তিক মূল্য সংযোজিত শিল্পে রূপ দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে রাণী মৌ উৎপাদন, প্রজনন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মৌখামার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশিক্ষণ জোরদার করা গেলে এ খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাঁর ভাষায়, সূর্যমুখী চাষের সম্প্রসারণ শুধু তেল দেবে না, মধু উৎপাদনের ভিত্তিও শক্ত করবে।
আরডিএ’র মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক বলেন, সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও শোধনের জন্য দেশে আধুনিক সলভেন্ট এক্সট্রাকশন প্রসেস প্ল্যান্ট গড়ে তোলা দরকার। তাঁর মতে, শুধু বীজ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; বীজ থেকে তেল আহরণ, শোধন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্যও একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে। তবেই সূর্যমুখীকে মাঠ থেকে শিল্পে এবং শিল্প থেকে বাজারে কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
ব্রিফিংয়ে গ্রামীণ উন্নয়নের আরও কিছু সম্ভাবনাময় খাতও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বায়োগ্যাসের মিথেন থেকে সিঙ্গেল সেল প্রোটিন উৎপাদন, খাল-বিল-জলমহলকে সমন্বিত বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা, নেনো ফার্টিলাইজার , আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন ও টিস্যু কালচার প্রযুক্তির প্রসার, এবং পল্লী জনপদভিত্তিক আবাসন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও আইসিটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত করে বেকারত্ব কমানোর কথাও গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তবে এসব উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পৃথক প্রকল্প, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে এ কথাও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী-মৌচাষের সমন্বিত মডেল বাস্তবায়ন করা গেলে একসঙ্গে ভোজ্যতেল উৎপাদন, মধু উৎপাদন, পরাগায়ন বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। মধু, মৌজাত পণ্য, সূর্যমুখী তেল ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াজাত খাতকে যুক্ত করা গেলে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী আয় বৃদ্ধির পথও খুলতে পারে এমন মত দেন উপস্থাপনায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, আরডিএ বগুড়ার এই উপস্থাপনায় যে বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তা হলো চর ও উপকূলের অনাবাদি জমি, সূর্যমুখী, মৌচাষ, গ্রামীণ শিল্প, জীবপ্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাল কর্মসংস্থানকে একই নীতিচিন্তার মধ্যে আনতে পারলে বাংলাদেশে নতুন কৃষি-অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হতে পারে। আর সেই পথ ধরে ভোজ্যতেল ও মধু আমদানির চাপ কমিয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বৈদেশিক আয় তিন ক্ষেত্রেই বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব।