মাজেদুর রহমানঃ
নিজের টিউশনির টাকা আর বাবা-মায়ের দেওয়া হাতখরচ তিলে তিলে জমিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরে যাবেন বলে। কিন্তু ভ্রমণের সেই আনন্দ আর রঙিন স্মৃতি জমানোর সুযোগ হেলায় বিসর্জন দিলেন তিনি। নিজের জমানো সেই আট হাজার টাকা নিয়ে দুই শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন বাঁচাতে ছুটে গেলেন এক জীর্ণ কুটিরে। তিনি জারিফ সাদাফ, বগুড়া বিয়াম মডেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি।
জারিফের এই মানবিক মহানুভবতার সাক্ষী হয়ে রইল বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা মালিপাড়া পশ্চিম পাড়ার দিনমজুর আব্দুর রশিদের পরিবার। অভাবের তাড়নায় যখন রশিদের দুই মেয়ে রোকাইয়া ও রোকসানার পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই দেবদূত হয়ে হাজির হলেন জারিফ।
আব্দুর রশিদের সংসার মানেই এক চিলতে উঠোনে দারিদ্র্যের হাহাকার। মাথার ওপর ফুটো টিনের চালা, অন্য ঘরটির চাল নেই—খোলা বারান্দায় কেবল খড়ির স্তূপ। এই চরম সংকটের খবর পাওয়া মাত্রই জারিফ সাদাফ তার ভ্রমণের জন্য জমানো পুরো টাকা তুলে দিলেন রশিদের বৃদ্ধ বাবার কাঁপাকাঁপা হাতে।
টাকা হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রশিদের বৃদ্ধা মা। দু’হাত তুলে জারিফের জন্য দোয়া করে তিনি বলেন, "বাবা, তুমি আমার নাতনিদের পড়ার পথ খুলে দিলে, আল্লাহ তোমার ভালো করবেন।" রশিদের স্ত্রীও সজল চোখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অভাবের কালো মেঘে ঢাকা পরিবারটি যেন ফিরে পায় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
এক অনাবিল প্রশান্তি নিয়ে জারিফ সাদাফ গণমাধ্যমকে বলেন, "বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে গেলে হয়তো কয়েকদিনের আনন্দ হতো, কিন্তু এই অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে যে প্রশান্তি পেলাম, তার কোনো তুলনা নেই। রোকাইয়া ডাক্তার হতে চায়, অর্থের অভাবে তার এই স্বপ্ন কেন মাঝপথে থেমে যাবে?"
জারিফের এই মানবিক মিশনে শুরু থেকেই পাশে ছিলেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক। মানবিকতার এই মিছিলে আরও শামিল হয়েছিলেন বিয়াম মডেল কলেজের সহ-সভাপতি সামিউল আতিক রাফিন, ফারদিন আহসান সিয়াম এবং শাজাহানপুর উপজেলা ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ।
বগুড়ার এই অজপাড়াগাঁয়ে জারিফ সাদাফরা আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা প্রমাণ করেছেন, ছাত্ররাজনীতির মূল আদর্শই হলো মানুষের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো। রোকাইয়াদের সজল চোখের কৃতজ্ঞতা আজ পুরো জনপদে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—মানুষ মানুষের জন্য।
সমাজের বিত্তবান ও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষরা যদি রোকাইয়াদের মতো স্বপ্নচারীদের পাশে এভাবেই দাঁড়ান, তবে হয়তো একদিন এই জীর্ণ কুটির থেকেই উঠে আসবে আগামীর কোনো দক্ষ চিকিৎসক।