‘চুরি স্বীকারে মারধর ও জোর করে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে’—মরিয়মের অভিযোগ
বগুড়া প্রতিনিধি:
বগুড়ার শাজাহানপুরে স্বর্ণালংকার চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ছয় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত এক গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে চুরির দায় স্বীকার করানোর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন মোছাঃ মরিয়ম খাতুন (৩৪) নামের ওই নারী।
মরিয়ম খাতুন শাজাহানপুর উপজেলার ফুলকোট গ্রামের বাসিন্দা। তার দাবি, তিনি দরিদ্র পরিবারের সদস্য এবং অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে জীবনযাপন করেন। তার মা শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং বাবা মারা গেছেন।
মরিয়মের অভিযোগ, উপজেলার রহিমাবাদ উত্তরপাড়ার হাসান আলী মিয়ার বাসায়ও তিনি নিয়মিত গৃহকর্মীর কাজ করতেন। হাসান আলী মিয়ার স্ত্রী হাফিজা খাতুন বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন সিনিয়র শিক্ষিকা। গত ২৪ মার্চ ২০২৫ সকালে ওই বাসায় কাজে গেলে হাফিজা খাতুন তাকে সেদিন কাজ না করে চলে যেতে বলেন। এরপর তিনি অন্য বাসায় কাজে চলে যান।
মরিয়মের ভাষ্য, ওইদিন বেলা পৌনে ১২টার দিকে হাফিজা খাতুন তার স্বামীসহ কয়েকজনকে নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে তিনি পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করেছেন বলে অভিযোগ করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালিয়েও কোনো স্বর্ণ না পেয়ে তাদের বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মরিয়ম আরও অভিযোগ করেন, একই দিন বিকেলে বড় বোনের বাসা থেকে তাকে ‘মেহমান এসেছে’ বলে হাফিজা খাতুন নিজের বাসায় নিয়ে যান। এরপর একটি কক্ষে আটকে রেখে স্বর্ণ চুরির দায় স্বীকার করানোর জন্য তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
তার দাবি, সন্ধ্যার পরও তাকে বাড়িতে ফিরতে না দেওয়ায় তার মা ও দুই বোন তাকে খুঁজতে হাফিজা খাতুনের বাসায় যান। একপর্যায়ে কান্নার শব্দ শুনে দরজা খোলা হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। মরিয়মের অভিযোগ, এ সময়ও তাকে মারধর করা হয়। পরে তার মা শাজাহানপুর থানায় গিয়ে পুলিশের সহায়তা চান।
মরিয়মের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের এসআই নূরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাত ১১টার দিকে দুই ব্যক্তির স্বাক্ষরযুক্ত মুচলেকার মাধ্যমে তাকে মা-বোনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা করান।
মরিয়মের দাবি, ঘটনার তিন দিন পর ২৭ মার্চ তার বিরুদ্ধে স্বর্ণ চুরির মামলা করা হয়। মামলায় ২১ ভরি স্বর্ণের মধ্যে তিন ভরি স্বর্ণ তিনি রান্নাঘরের কার্নিশ থেকে বের করে দিয়েছেন এবং বাকি ১৮ ভরি স্বর্ণের সন্ধান দেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে তার দাবি, মামলার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি অভিযোগ করেন, ৬ এপ্রিল ২০২৫ তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। পরে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ওই জবানবন্দির একটি ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সেটিও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মরিয়ম।
মরিয়মের আরও অভিযোগ, থানায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কুদ্দুস তাকে হাফিজা খাতুনের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে হাফিজা খাতুন, তার স্বামী হাসান আলী ও একই ভবনের এক ভাড়াটিয়াসহ তিনজন তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করেন এবং মিষ্টি খাতুন নামে এক নারীর নাম বলার জন্য চাপ দেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন।
পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় আইনজীবীর মাধ্যমে ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন বলেও জানান মরিয়ম।
এদিকে, মরিয়মের দাবি, তাকে পুলিশ উদ্ধার করে পরিবারের জিম্মায় দিয়ে গেলেও মামলায় উল্টো তার মা-বোনেরা পুলিশকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়টিকেও তিনি ‘মিথ্যা ও সাজানো’ বলে দাবি করেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধারণ করা ভিডিও কীভাবে বাদীপক্ষের হাতে গেল—এ প্রশ্ন তুলে মরিয়ম বলেন, ওই ভিডিও গ্রামের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এতে গৃহকর্মীর কাজেও তার ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মরিয়ম বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তার অভিযোগ, মামলার বাদীপক্ষের লোকজন বিভিন্ন সময়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। বিশেষ করে তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে পুনঃতদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।