১ আশ্বিন, ১৪৩৩

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জয়পুরহাটে মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জেলও খেটেছেন, তবু সেবার পথ ছাড়েননি ইয়াকুব

মোঃ মোকাররম হোসাইন জয়পুরহাট প্রতিনিধি: প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ৬:১৯ অপরাহ্ন
জয়পুরহাটে মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জেলও খেটেছেন, তবু সেবার পথ ছাড়েননি ইয়াকুব

জয়পুরহাটে মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জেলও খেটেছেন, তবু সেবার পথ ছাড়েননি ইয়াকুব

 

মোঃ মোকাররম হোসাইন 

জয়পুরহাট প্রতিনিধি:

১৮.৬.২৬

নিজের চিকিৎসার টাকা নেই, নিয়মিত ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই। বয়স পেরিয়েছে সত্তর। শরীরজুড়ে বার্ধক্য আর নানা রোগব্যাধির ভার। তবুও প্রতিদিন সকালে হলে একটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে খোঁজ নেন অসুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী কখনো নিজের টাকায়, কখনো মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা  সংগ্রহ করে কিনে দেন ওষুধ। কোনো রোগী হাসপাতালে যেতে না পারলে তাকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। গত এক যুগ ধরে নীরবে- নিভৃতে এমন মানবসেবা করে যাচ্ছেন জয়পুরহাট সদর উপজেলার সিট-হরিপুর গ্রামের সুক্টিপাড়ার বাসিন্দা ইয়াকুব আলী।

এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত “ডাক্তার ইয়াকুব ভাই” কিংবা “গরিবের ডাক্তার” নামে। যদিও তিনি কোনো চিকিৎসক নন, নেই কোনো চিকিৎসা সনদ। তবুও মানবিকতা, সহমর্মিতা আর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাই তাকে এলাকার মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।

কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ইয়াকুব আলী ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হয়নি। জীবনের বেশিরভাগ সময় সাধারণ কৃষক হিসেবেই কাটিয়েছেন। তবে প্রায় এক যুগ আগে একটি ঘটনা তার জীবনকে অন্য পথে নিয়ে যায়।

ইয়াকুব আলী জানান,একদিন জয়পুরহাট শহরের শহীদ ডা. আবুল কাশেম ময়দানের পাশে এক অসহায় রোগীকে চিকিৎসার অভাবে কাতরাতে দেখেন। চারপাশে অসংখ্য মানুষ থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি নিজের অর্থ খরচ করে ওই ব্যক্তিকে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান এবং চিকিৎসার খরচ বহন করেন। রোগী সুস্থ হওয়ার পর তার চোখের জল আর কৃতজ্ঞতা যেন ইয়াকুব আলীর জীবন বদলে দেয়। এরপর থেকেই মানবসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।

বর্তমানে সদর উপজেলার সিট-হরিপুর, দোগাছী, ভাদসা, ভাটুরিয়া, চকবরকতসহ আশপাশের ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে নিয়মিত ছুটে যান তিনি। কোথাও বৃদ্ধা মা ওষুধের অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, কোথাও দিনমজুর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী, আবার কোথাও অর্থের অভাবে হাসপাতালে যেতে পারছেন না কোনো রোগী, এমন খবর পেলেই ছুটে যান ইয়াকুব আলী।

স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন,আমরা গরিব মানুষ। অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। ইয়াকুব ভাই নিজে এসে খোঁজ নেন, ওষুধ কিনে দেন। তিনি না থাকলে অনেক সময় চিকিৎসাই করাতে পারতাম না। আমাদের কাছে তিনিই সবচেয়ে বড় ডাক্তার।

একই গ্রামের আব্দুস সাত্তার  বলেন, আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল। ইয়াকুব ভাই নিজে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন,ডাক্তার দেখিয়েছেন, ওষুধ কিনে দিয়েছেন। বিনিময়ে কখনো কিছু চাননি।এমন মানুষ এখন খুব কম দেখা যায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শামসুল আলম বলেন,ইয়াকুব আলী একজন বিরল মানবিক মানুষ। অন্যের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রায় আড়াই বিঘা জমি মানুষের জন্য খরচ করেছেন।আজকের সমাজে এমন নিঃস্বার্থ মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে গিয়ে ইয়াকুব আলীকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছে। অসহায় মানুষের ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে একে একে বিক্রি করেছেন পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। পরে সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় এক মাস কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে। কয়েক বছর আগে হারিয়েছেন জীবনসঙ্গীকেও। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগলেও অর্থাভাবে অনেক সময় নিজের চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেন না।

তার ছেলে তৌহিদ হাসান বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখেছি বাবা নিজের কথা না ভেবে মানুষের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন। একসময় ঋণের দায়ে জেলেও যেতে হয়েছে। তখন খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আজ যখন দেখি মানুষ বাবাকে কত ভালোবাসে, কত সম্মান করে, তখন গর্বে বুক ভরে যায়। আমরা দুই ভাই চাকরি করে যতটুকু পারি বাবাকে সহযোগিতা করি, যাতে তিনি মানুষের পাশে থাকতে পারেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইয়াকুব আলী কোনো এনজিও নন, কোনো বড় সংগঠনেরও সদস্য নন। তারপরও একা হাতে যেভাবে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। রাষ্ট্র কিংবা সমাজের বিত্তবানরা যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আরও অনেক অসহায় মানুষ উপকৃত হবে।

তবে নিজের ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই ইয়াকুব আলীর। শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, মানুষের সেবা করতে পারলেই আমার ভালো লাগে। আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন এই কাজ করে যেতে চাই। গরিব মানুষের মুখের হাসি আর দোয়ার চেয়ে বড় সম্পদ আমার কাছে আর কিছু নেই।

নিজের জীবনকে প্রায় নিঃস্ব করে অন্যের জীবন বাঁচানোর যে নীরব সংগ্রাম ইয়াকুব আলী চালিয়ে যাচ্ছেন, তা আজও মানবতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে দেয়। স্বার্থের এই সময়ে তিনি যেন এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। একজন মানুষ, যিনি নিজের চেয়ে অন্যের কষ্টকে বড় করে দেখেছেন সারাজীবন।