জয়পুরহাটে আর্থিক সংকটকে পেছনে ফেলে মেধার জয় করেছে কণিকা পাল
মোঃ মোকাররম হোসাইন
জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
১৭.৮.২৬
নানা প্রতিকূলতা ও পরিবারের আর্থিক সংকটকে পেছনে ফেলে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এসএসসি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন কণিকা রাণী পাল। তাঁর এই সংগ্রাম ও সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। নাছোড়বান্দা কণিকা এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়েছে। পরীক্ষায় তার প্রাপ্ত নম্বর ১১৭২। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় কণিকা জয়পুরহাট সদর উপজেলার মাধাইনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমন ফলাফল করেছে। তাঁর এই অর্জন দরিদ্র বাবা-মা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও আশপাশের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করলেও অভাবের কারণে পড়ালেখার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কণিকার।
সদর উপজেলার আমদই ইউনিয়নে মাধাইনগর বাজারের পাশেই তাদের জরাজীর্ণ একটি মাটির বাড়ি। বাবা গোপাল চন্দ্র পাল দরজি শ্রমিক। তিনি জয়পুরহাট শহরের একটি টেইলাসে স্বল্প বেতনে কাজ করেন, আর মা মালতি রাণী পাল বাড়িতে মাটির পাত্র তৈরির কাজ করেন। পারিবারিক অভাব-অনটন ও সংগ্রাম কণিকার পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন অতিবাহিত করেছে। বাড়তি খরচ চালানোর মত সংগতি নেই তার বাবা-মা’র। অথচ পড়ালেখা করে চিকিৎসক হয়ে অসহায় মানুষদের সেবা করার অদম্য ইচ্ছে কণিকার। কিন্তু সেই সাধ কি আদৌ পূরণ হবে তার ?
ছোটবেলা থেকেই মেধাবি ছিলেন কণিকা এমনটাই জানান তাঁর বাবা-মা ও শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ে প্রতিটি শ্রেণিতে কণিকার রোল ছিল এক থেকে তিনের মধ্যে। পড়ালেখার প্রতি তার চরম আগ্রহের কারনে বাবা-মা দারিদ্রতার কষাঘাতে সংসার নির্বাহে খেয়ে-নাখেয়ে দিন পার করলেও মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করেননি। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ভালো ফলাফলের জন্য কণিকা প্রধান শিক্ষক এনামুল হকের স্নেহের নজর কেড়েছিলেন। তাইতো বেতন ভাতা থেকে শুরু করে তিনি বিদ্যালয়ের যাবতীয় ব্যয়ভারে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কণিকা’র পড়ালেখায় সহযোগিতা করেন। আর সারা বছর বিনা টাকায় টিউশনিতে সহযোগিতা করেন স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক। শত বাধা পেরিয়ে সকলের সহযোগিতায় কণিকা এবার এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজেকে মেধাবি হিসেবে প্রমাণ করেছে। কিন্তু বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে এতদিন বিদ্যালয়ে পাঠদানে অংশ নিলেও কলেজে পড়ার মত সামর্থ তার বাবা-মা’র নেই। তাই বাধ্য হয়ে পড়ালেখা বন্ধ করা ছাড়া তার কোন উপায় নেই। এমন দুশ্চিন্তায় অশ্রæ ভারাক্রান্ত হয়ে দিন কাটছে কণিকা পালের।
মা মালতি রাণী পাল বলেন, মেয়েটা সারক্ষণ বই নিয়ে পড়ে থাকে। ঘরে তেমন কিছু খাবার না থাকায় খেতেও পায়না। অভাবের কারণে পড়ালেখা বন্ধের কথা বললেই তার দুচোখ দিয়ে জল ঝরে। ওর বাবা সেই সকালে বের হয়ে সারাদিন অন্যের দোকানে দর্জিগিরি করে রাতে বাড়ি ফিরে। মেয়েটার তেমন খোজ-খবরও নিতে পারেনা। সামান্য আয়ে সংসারও চলে না। নিজের ভাঙ্গাচোরা বাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। নিজেও বসে থাকি না। মাটির পাত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। দু’জনের এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাবো ? না মেয়েকে পড়ালেখা করাবো ?
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক বলেন, অষ্টম শ্রেণীর শেষ পর্যায়ে অভাবে পড়ে এক সময় কণিকার পড়ালেখা বন্ধ করে দেয় তার বাবা। বিষয়টি জানার পর মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে তাকে সহযোগিতা করেছি। অর্থ অভাবে মেয়েটি যদি কলেজে ভর্তি হতে না পারে তাহলে এই অর্জণ বিলিন হয়ে যাবে। তাই ওর প্রতি সবাইকে সহযোগীতার হাত বাড়াতে অনুরোধ করছি।
প্রতিবেশি মাধাইনগর বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মিলটন খন্দকার বলেন, অভাবের কারণে অনেক সময় অনাহারেও দিন কাটে ওদের। এ অবস্থায় মেধাবি কণিকা পালের পাশে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক এনামুল হক বলেন, শুধু কণিকা নয় অভাবের কারণে স্কুলের কোন দরিদ্র শিক্ষার্থীর যেন পড়ালেখা বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা সবসময় থাকবে। এবার বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৯জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ৪২ জন। ৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। যাদের মধ্যে কণিকা পাল সবচেয়ে ভাল ফলাফল করেছে। অভাব অনটন ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কণিকার পথচলাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে কণিকা শিক্ষাক্ষেত্রে ও নিজের জীবনে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। শুধুমাত্র খরচের কারণে এ ধরণের মেধাবিদের পড়ালেখায় সামর্থবানদের সহযোগিতার আহবান জানান তিনি।