১ আশ্বিন, ১৪৩৩

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বগুড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন

মেহেদী হাসান লিটনঃ প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ৭:৩১ অপরাহ্ন
বগুড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন

বগুড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন

 

শোভাযাত্রায় সম্প্রীতির বার্তা, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’: রেজাউল করিম বাদশা, এমপি

 

মেহেদী হাসান লিটনঃ

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবের আমেজ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে বগুড়ায় উদযাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী। আজ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, বগুড়া জেলা শাখা এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, বগুড়া জেলা শাখার উদ্যোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য বর্ণনার আয়োজন করা হয়।

 

সকালে বগুড়া শহরের খোকন পার্ক থেকে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। ধর্মীয় পতাকা, ব্যানার ও বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপনায় সাজানো শোভাযাত্রায় সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় ভক্তদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ ও ধর্মীয় আবেগ।

 

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে আবির্ভূত হন। অন্যায়, অত্যাচার ও অধর্মের অবসান এবং সত্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তাঁর আবির্ভাব ঘটে বলে বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাই জন্মাষ্টমী শুধু একটি জন্মতিথি স্মরণের উৎসব নয়; সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেও দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

 

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মন্দির ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। অনেক ভক্ত উপবাস ও ব্রত পালন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মধ্যরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মক্ষণ স্মরণ করে বিশেষ পূজা ও অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়।

 

শ্রীকৃষ্ণের শিশু রূপকে নতুন পোশাক পরানো, দুধ, ঘি ও মধু দিয়ে অভিষেক, মাখন-মিছরি, ক্ষীরসহ বিভিন্ন ভোগ নিবেদন এবং তুলসী পাতা অর্পণের মধ্য দিয়ে ভক্তরা জন্মাষ্টমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। মন্দির ও ঘরবাড়ি ফুল ও আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। ভজন-কীর্তন, গীতা পাঠ, কৃষ্ণলীলা, নৃত্য-নাট্যসহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। জন্মাষ্টমীর পরদিন অনেক স্থানে ‘নন্দোৎসব’ পালনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ আরও বিস্তৃত হয়।

 

‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।”

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের মানুষের দেশ। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও দেশের প্রতি সবার দায়িত্ব ও ভালোবাসা অভিন্ন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

 

রেজাউল করিম বাদশা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের জীবনযাত্রা নির্বিঘ্ন করা এবং নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো কাজ করে যাচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত র‍্যালী ও শোভাযাত্রার সফলতা কামনা করে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাংলাদেশের ঐতিহ্য। সব ধর্মের মানুষ যাতে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পালন করতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ পুলিশ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

 

তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশ সবসময় পাশে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

 

বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। এসময় আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান সন্ধান সরকার ও সাধারণ সম্পাদক এম.আর হাসান পলাশসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

 

পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে সম্প্রীতির মিলনমেলা

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, বগুড়া জেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি শ্রী পরিমল চন্দ্র দাস। তিনি বগুড়া পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র-১ এবং বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু রায় নির্মল।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, বগুড়া জেলা শাখার উদ্যোগেও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পৃথক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের জেলা শাখার আহ্বায়ক অতুল চন্দ্র দাস এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব গৌর চন্দ্র পোদ্দার (চন্দন), এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট এর বগুড়া মহানগর আহবায়ক প্রকৌশলী সঞ্জয় চন্দ্র মহন্ত পুলক।

 

ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষায় সম্প্রীতির বাংলাদেশ

বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের অন্যতম শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সত্যের অনুসরণ এবং মানবকল্যাণে কাজ করা। সেই মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

 

তাঁরা বলেন, ধর্মীয় উৎসবগুলো মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

 

শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বগুড়ার এই আয়োজন তাই শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে শান্তি, মানবিকতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির প্রত্যয়। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভাকে ঘিরে দিনভর বগুড়া শহরে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ।